Bongobondhu

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান রাষ্ট্র তার পূর্ব অংশের (বর্তমান বাংলাদেশ, ঐতিহাসিকভাবে পূর্ব বাংলা) স্বাধীনতাকামী জনগণের ওপর যে সামরিক অভিযান শুরু করে, তা শেষ হয় ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের অক্সিলারি ফোর্স রাজাকার-আলবদর-আলশামসের আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। এই ২৬৬ দিনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের অক্সিলারি ফোর্সগুলোর তাণ্ডবকে নানা শব্দ প্রয়োগে প্রকাশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে 'গণহত্যা' শব্দটি সব থেকে বেশি প্রচলিত। বাংলাদেশ সরকার ২৫ মার্চকে 'আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস' পালনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু গভীর বিশ্নেষণে প্রশ্ন তোলার সুযোগ আছে, পাকিস্তানের নির্দেশে তাদের সেনাবাহিনী ও অক্সিলারি ফোর্সগুলো যে কার্যক্রম চালিয়েছিল তা কি 'গণহত্যা' ছিল অথবা 'শুধুই গণহত্যা'? গণহত্যা- এই বাংলা শব্দটির ইংরেজি ধারণা হলো 'মাস কিলিং বা মাস মার্ডার বা ম্যাসাকার'।

যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের মতে, 'কোনো ঘটনায়, কোনো বিরতি ছাড়াই যদি চারের অধিক মানুষকে হত্যা করা হয়, সেটা মাস মার্ডার।' ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর লাসভেগাসের মিউজিক ফেস্টিভ্যালে স্টিফেন প্যাডক নামে এক ঘাতক গুলি করে ৫৮ জনকে হত্যা করে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ বা উদ্দেশ্য ছাড়াই। এটিও মাস মার্ডার, যদি আমরা বাংলায় বলি- তা হলো গণহত্যা। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতাকামী বাঙালি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংঘটিত কার্যক্রমকে স্রেফ 'গণহত্যা' বলে সংজ্ঞায়িত করা- বিষয়টির গুরুত্বকে 'সামান্যকরণ' করে কিনা ভাবার সুযোগ রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৮ সালে প্যারিসে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গৃহীত হয় 'জেনোসাইড কনভেনশন'। দ্বিতীয় ধারায় জেনোসাইডের একটা স্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করে বলা হয়- একটা জাতি বা গোত্র বা নৃতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে সংঘটিত কার্যক্রমগুলো 'জেনোসাইড'। রাজনৈতিক কারণে যত বেশি সংখ্যক হত্যাকাণ্ডই ঘটুক না কেন, সেটি গণহত্যা হতে পারে; কিন্তু জেনোসাইড বলে স্বীকৃত হবে না। লক্ষণীয়, এই ধারায় 'ইনটেন্ট টু ডেস্ট্রয়' গুরুত্ব পেয়েছে। অর্থাৎ ধ্বংস করার ইচ্ছাটাও জেনোসাইড। একটা জাতি, গোত্র, নৃতাত্ত্বিক বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে ফেলার প্রকাশ্য ঘোষণা বা ধ্বংস করার জন্য কাউকে উৎসাহিত করাও জেনোসাইড এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭১-এর পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা দেখি- যেসব নির্যাতনমূলক কার্যক্রমকে জেনোসাইড বলা হয়েছে অর্থাৎ হত্যা, শারীরিক ও মানসিক আঘাত, সম্পদ লুট, ধর্ষণ- এর সবকিছুই পাকিস্তানি পক্ষ কর্তৃক এখানে সংঘটিত হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- এসব জেনোসাইডাল অ্যাক্ট সংঘটিত হয়েছে একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে আর তা হলো, বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে দেওয়া। আর্টিকেল দুইয়ে জেনোসাইডের সংজ্ঞায় যা বলা হয়েছে 'ইনটেন্ট টু ডেস্ট্রয়'। এই ইনটেন্ট বা অভিপ্রায়ের শুরু ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ নয় বরং পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির শুরু থেকেই।

১৯৪৮ সালে মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ কর্তৃক উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা, ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে গুলি করে হত্যা, রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ, আরবি হরফে বাংলা লেখানোর চেষ্টা- এগুলো যেমন ছিল বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ধ্বংস করার অভিপ্রায়, তেমনি অর্থনৈতিক বৈষম্যের মাধ্যমে ও বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করা চেষ্টা করা হয়েছে। বাঙালি 'প্রকৃত মুসলমান নয়', 'দুর্বল, কালো, বেঁটে'- এ রকম চিহ্নিত করে বাঙালি জাতির প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়ানো হয়েছে সুপরিকল্পিতভাবে। মূলত ১৯৪৮ থেকেই জেনোসাইডের প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে এবং ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ রাত থেকে তার কার্যক্রম শুরু।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান নাৎসি বাহিনী ইহুদিদের বিরুদ্ধে যে জেনোসাইড ঘটায় সেটি হুট করে ঘটে যাওয়া ঘটনা ছিল না। এর আগের কয়েক বছর ধরে প্রেক্ষাপট তৈরি করা হয়েছে, ইহুদিদের বিরুদ্ধে সামাজিক ঘৃণা তৈরি করা হয়েছে, নিজেদের উৎকৃষ্টের গরিমা প্রচার করে রাষ্ট্রীয় সব সমস্যার কারণ হিসেবে ইহুদিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সমস্যার সমাধান হিসেবে ইহুদিদের নির্মূল করে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে একেবারে ঠান্ডা মাথায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে।

এ ক্ষেত্রে ২০ জানুয়ারি ১৯৪২ 'ওয়ানসি কনফারেন্স' প্রণিধানযোগ্য। জার্মান শহরতলির সুন্দর মনোরম পরিবেশে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, নানা বাহিনীর লোকজন সারাদিন ধরে আলোচনা করে। দুপুরে লাঞ্চ ও বিকেলের কফি পান করতে করতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে অধিকৃত ইউরোপের নানা দেশ থেকে ইহুদিদের তাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে পোল্যান্ডে। তারপর সমূলে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই পরিকল্পনার একটা সুন্দর নামও গৃহীত হয়েছিল সেই কনফারেন্সে। ইংরেজিতে- 'ফাইনাল সল্যুশন টু দ্য জুইশ কোয়েশ্চেন'।

রবার্ট পাইন তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'ম্যাসকার'-এ ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের একটি গোপন সভার কথা উলেল্গখ করেছেন, যেখানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছেন- 'কিল থ্রি মিলিয়ন অব দেম অ্যান্ড দ্য রেস্ট উইল ইট আউট অব আওয়ার হ্যান্ডস'। যদিও জেনোসাইড কনভেনশনের দ্বিতীয় ধারায় আলাদাভাবে ধর্ষণকে জেনোসাইডাল অ্যাক্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবু পরবর্তীকালে বিশেষজ্ঞরা মতামত ব্যক্ত করেছেন- 'জেনোসাইডাল রেপ' একটা জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয় বলে এটিও জেনোসাইডাল অ্যাক্ট।

জেনোসাইড বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী, তাদের সহযোগী বিহারি ও রাজাকার বাহিনী দুই থেকে চার লাখ বাঙালি নারী 'জেনোসাইডাল রেপ'-এর শিকার হয়েছে। এই ধর্ষণগুলো স্রেফ যৌন তাড়না ছিল না। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাদের সৈনিকদের উস্কে দিয়েছে। এমনকি ধর্মীয় ফতোয়াও জারি করা হয়েছিল। এসব ধর্ষণের উদ্দেশ্য ছিল- বাঙালি জাতিসত্তার স্বকীয়তা শেষ করে দেওয়া, বাঙালি নারীর গর্ভে পাকিস্তানি সন্তান জন্ম দেওয়া- যারা অনুগত থাকবে তাদের পিতৃগোষ্ঠীর প্রতি। জাতি ধ্বংসের এই অভিপ্রায়ই জেনোসাইড।

এ আলোচনায় আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে- ২৬৬ দিনে টার্গেট কিলিং হয়েছে কী রকম? শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবীসহ সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণি। এই হত্যাগুলোর উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিগোষ্ঠীকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে শূন্য করে দেওয়া। ভুলে গেলে চলবে না- এক কোটি মানুষকে ভারতে দুঃসহ শরণার্থী জীবন বেছে নিতে হয়েছিল। দেশের ভেতরে আরও দুই থেকে চার কোটি মানুষকে প্রাণ বাঁচাতে অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতির শিকার হতে হয়েছে।

www.1971archive.org-এর কাজ করতে গিয়ে আমরা আরও কিছু বিষয়ের সম্মুখীন হয়েছি, যেগুলো সাধারণত আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত আলোচনায় অনুল্লেখ্য। এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে কয় লাখ রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল? মেঘালয়ের খাসিয়া হিলসে বালাট শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ। তাদের মধ্যে প্রায় ৫০ হাজার মারা গিয়েছিলেন কলেরা ও ডায়রিয়ায়। আমরা সাক্ষ্য পেয়েছি- নারীদের পাশাপাশি পুরুষ, শিশু ও কিশোররা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন উলেল্গখযোগ্য মাত্রায়। বেসামরিক গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে বোমারু বিমানের আঘাতে। হাসপাতালে ঢুকে হত্যা করা হয়েছে কর্মরত চিকিৎসক ও সেবিকাদের।

একাত্তরের ২৬৬ দিনে এখানে পাকিস্তান আর্মি ও তাদের অক্সিলারি ফোর্স যা ঘটিয়েছে, সেটা নিছক হত্যা বা গণহত্যা নয়। গণহত্যা অবশ্যই ঘটেছে; কিন্তু সেটা জেনোসাইডের একটা উপাদান হিসেবে, স্রেফ গণহত্যা বলে একাত্তরের বিভীষিকাকে প্রকাশ করা যায় না। জেনোসাইডের বাংলা গণহত্যা নয়, জেনোসাইড নিজেই একটা অর্থবোধক শব্দ হিসেবে প্রচলিত, এর অনুবাদ জরুরি নয়।

নিজেদের প্রয়োজনেই এসব শব্দ ব্যবহারে আমাদের জানা, বোঝা ও বোধগম্যতার প্রয়োজন আছে, প্রয়োজন আছে সচেতনতা ও সতর্কতার। জাতিসংঘ কর্তৃক জেনোসাইডের স্বীকৃতি বিষয়টি নিয়ে ভাবলেই এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী ১৯৭১-এর ধ্বংসযজ্ঞ একটি স্পষ্ট জেনোসাইড; কিন্তু দুঃখজনকভাবে এটি এখনও জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত জেনোসাইড নয়। পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন আমেরিকান কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড ওয়াশিংটনে যে জরুরি টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন তার শিরোনাম ছিল- 'সিলেকটিভ জেনোসাইড'। অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের সেই বিখ্যাত রিপোর্টটিরও শিরোনাম ছিল 'জেনোসাইড'।

বাংলাদেশ জেনোসাইডের পরে সংঘটিত কম্বোডিয়া, রুয়ান্ডা ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনার জেনোসাইড জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশেষ করে বসনিয়া-হার্জেগোভিনার জেনোসাইড অতি দ্রুত স্বীকৃতি পেয়েছিল। এর পেছনের কিছু কার্যকারণ বিবেচনা করা জরুরি। যখনই কোনো জেনোসাইড জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত হয়ে যায়, তখন আর সেটি কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে না, এটি তখন আন্তর্জাতিক ইস্যু। জাতিসংঘ ও রাষ্ট্রগুলোর ত্বরিত দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায় জেনোসাইড বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার, প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও। শুধু তাই নয়, জেনোসাইড থামানোর পর এর জন্য দায়ীদের শাস্তি বিধান করাও জাতিসংঘের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

এই পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা ইস্যুও প্রাসঙ্গিক হতে পারে। জাতিসংঘ কিংবা আন্তর্জাতিক কোনো পক্ষ এখনও একে জেনোসাইড বলছে না। কারণ জেনোসাইড বললেই দায়িত্ব এসে পড়বে এটি বন্ধ ও বিচার করার। যুক্তরাষ্ট্র 'এথনিক ক্লিনজিং' বলেছে, যা আইনি কাঠামোতে শাস্তিযোগ্য বলে এখনও স্পষ্ট নয়।

জেনোসাইড বাংলাদেশ- জাতিসংঘ কর্তৃক এখন পর্যন্ত স্বীকৃত না হওয়ার পেছনে আমাদের নিজেদের জানা, বোঝা ও কূটনৈতিক এবং একাডেমিক উদ্যোগের অভাব তো অবশ্যই রয়েছে, সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও জড়িত আছে। বিশ্বের পরাক্রমশীল দুই পরাশক্তি চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ভূমিকা তখন অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পাবে। বিষয়টি তাই সহজ নয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নৃশংস এই জেনোসাইডের স্বীকৃতি অবশ্যই জাতিসংঘকে দিতে হবে মানবতার বৃহত্তর স্বার্থে। এই বৃহৎ প্রেক্ষাপটের শুরু হতে পারে আমাদের 'জেনোসাইড' বিষয়টি বোঝা এবং একাত্তরের পরিপ্রেক্ষিতে 'গণহত্যা'র বদলে 'জেনোসাইড' শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে।